ফেসবুকে ভাইরাল খুকসার আঞ্চলিক ভাষা

আশিক হাসানঃ সংস্কৃতির রাজধানী কুষ্টিয়ার খোকসা থানা তাঁর স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি এবং সংস্কৃতির জন্য আলাদা জনপ্রিয়তা আছে। খোকসার মানুষ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। উপজেলার মানুষের মন ও মুখে উচ্চারিত হয় নিজস্ব কিছু ভাষা, যা বই পুস্তকে নেই। আঞ্চলিকতার টান ও মধু মিশ্রিত সেই কথাগুলো সভ্যতার উৎকর্ষতার ডমাডোলে হারিয়ে যেতে বসেছে। মুখ নিঃসৃত সেই সব মিষ্টি ভাষা হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে খোকসাবাসীর মধ্যে।

কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি থানার আঞ্চলিক ভাষা বিভিন্নরকম। তার মধ্য খোকসা থানার আঞ্চলিক ভাষা ইউনিয়ন ভেদে ভিন্নতা রয়েছে। যদিও কালের বিবর্তনে আঞ্চলিক ভাষার অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে।প্রত্যান্ত অঞ্চলেও শিক্ষার হার অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাই এখন শুদ্ধ বাংলা বলার চেষ্টা করে। তার পরেও বয়স্ক মহিলাদের মুখে এবং গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত ও মুর্খ লোকদের মুখে এখনও প্রচুর আঞ্চলিক ভাষা শুনতে পাই।

ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। গ্রুপের নাম “খুকসা’র আঞ্চলিক ভাষা ।” প্রথমে গ্রুপটি ক্রিয়েট করা হয় R.A. Rashed নামক আইডি থেকে। ইনভাইট করা হয় খোকসার মানুষদেরই। সবাই গ্রুপে ঢুকে দেখে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে একটা গ্রুপ। R.A. Rashed অ্যাডমিন আর Aynul Hossain Sanu মডারেটর। মানুষ সখের বশে দুই একটা পোস্ট করতে থাকে। দুই একজন কমেন্টও করতে থাকে। মোটামুটি মজা পেতে থাকে মানুষ। দেখলাম গ্রুপের সদস্য কম হলেও অ্যাকটিভিটি বাড়তেছে। পোস্ট এর লাইক কমেন্ট বাড়তে থাকে। আমিও সখ করে অ্যাডমিন হবার জন্য পোস্ট দিলাম। জানিনা কি মনে করে আমার বন্ধু রাশেদ অ্যাডমিন দিল আমাকে। আমার আগেই এলাকার সিনিয়র কল্লোল ভাই, কুষ্টিয়ার সময়ের কর্নধার ও মোহনা টেলিভিশনের সাংবাদিক মনি ভাই, খোকসা স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক গালিব অ্যাডমিনে ছিল। মডারেটর হিসাবেও ছিল খোকসার অতি পরিচিত ফটোগ্রাফার অসীম বিশ্বাস। আমি তখনও সানু ভাইকে চিনতাম না। গ্রুপের সদস্যও অনেক কম ২০০ জনের মত। তখন একটা পোস্টে দেখলাম খুব লাইক কমেন্ট হচ্ছে। পোস্টটি ছিল গালিবের। পোস্টটি ছিল এমনঃ

খুকসায় কারে বাড়ি কোনে ইটু কয়া যান। আমারে বাড়ি শোমসপুর। আপনেরে বাড়ি কোনে??

আমি অ্যাডমিন হবার পরেই অনেক বেশি দায়বদ্ধতা অনুভব করি গ্রুপের প্রতি। কেননা মনি ভাই আমার সম্পর্কে অনেক প্রশংসা করেছিল শানু ভাইয়ের কাছে। শানু ভাইও কল করে প্রথমেই কিছু দিক নির্দেশনা দিল। গ্রুপের উপদেষ্টা এবং অ্যাডমিন হিসাবে বাবুল আঙ্কেলকেও পেয়ে গেলাম। দেখলাম খোকসার অতি পরিচিত মুখ মোঃ কামরুজ্জামান সোহেল ডাক্তার আঙ্কেলও গ্রুপে একাত্বতা প্রকাশ করে পোস্ট দিচ্ছে। আমার ফেসবুক আর ফেসবুক গ্রুপ সম্পর্কে অল্পবিস্তর ভালো ধারনা এবং অভিজ্ঞতা ছিল, পাশাপাশি কুষ্টিয়ার সময় এবং খোকসা ইয়ুথ ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীকও ভালো ইমেজ থাকা বা গ্রুপের সিনিয়র অ্যাডমিন ভাই এবং সদস্যদের মধ্যে খোকসার অনেক গণ্যমান্য লোক থাকায় এক রকম ভালো দক্ষতা এবং নেতৃত্ব দেখানোর একধরনের চাপও কাজ করছিল। একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপও খুললাম অ্যাডমিনদের জন্য। ওখানে গ্রুপের বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক প্রস্তাবনা দিতাম সিনিয়রদের কাছে। বিভিন্ন সৃজনশীল পোস্ট করে করে সদস্যদের গ্রুপে আরও অ্যাক্টিভ করতে লাগলাম। একে একে গ্রুপে অনেক সিনিয়র আঙ্কেল, ভাইয়েরা দেখলাম পোস্ট-কমেন্ট করতেছে। শয়ন ভাইকেও অ্যাডমিন প্যানেলে আনা হলো। তখন পর্যন্তও বিষয়গুলো ছিল স্বাভাবিক এবং মনে হচ্ছিল ক্ষনস্থায়ী একটা বিষয় বা ঘটনা মাত্র। অনেকটা ঈদের কয়েকদিনের ছুটির মত।

২৮ তারিখ রাত থেকে বিষয়গুলো বদলাতে থাকে। হিংসাকাতর, ক্ষুদ্রমানসিকতার কিছু জ্ঞানপাপী বিষয়টাকে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে অন্যদিকে প্রভাবিত করে উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যক্তিস্বার্থ লাভের প্রচেষ্টা শুরু করে। হাতে গোনা ২-৩ জন তাঁদের আইডিতে গ্রুপের বিপক্ষে অযৌক্তিক প্ররোচনা চালাতে থাকে। বিভিন্ন মানুষের ইনবক্সেও অপপ্রচার চালানো হয়। এর মধ্যে ছাত্রলীগের নাম এবং ক্ষমতা দেখিয়ে বিভিন্ন জনকে হুমকি এবং সোশাল মিডিয়ায় অশোভন এবং অকথ্য ভাষায় গালি দেয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সিনিয়র নেতারা সব জেনেও নিরব ভূমিকা পালন করেন। মজার বিষয় এই সমালোচকদের সমালোচনাতেও ছিল আঞ্চলিক এবং বাংলিশ ভাষার ব্যবহার। সিনিয়র অ্যাডমিনরা তাঁদের বিভিন্নভাবে বুঝালেও তাঁদের আচরন ছিল আক্রমনাত্বক এবং অসৌজন্যমূলক। তাঁরা তাঁদের বাচনভঙ্গী দিয়ে তাঁদের থেকে ১৫-২০ বছরের সিনিয়র বড়ভাইদেরও গালিগালাজ করে। এই বিষয়ে সুযোগ থাকা সত্তেও গ্রুপের অ্যাডমিনেরা আইসিটি মামলা বা প্রতিশোধমূলক কার্যক্রমে জাননি। তাঁরা বিরোধীদের ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং তাঁদের নিয়ে না ভেবে গ্রুপের বিভিন্ন কাজে মন দেয়। গ্রুপের বিরোধীদের পোস্টে সাধারন মানুষই তাঁদের বিরুদ্ধে বলেছে। তাছাড়া খোকসার ৯৯ ভাগ লোকই গ্রুপটা পজিটিভভাবে নিয়েছে। গ্রুপে নিত্যনতুন কার্যক্রম সাধারন মানুষকে উৎসবমূখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। একাধারে চলছে শব্দ ভান্ডার সংগ্রহের কাজ। এছাড়া এলাকর তথ্যভিত্তিক ডকুমেন্টারী ও পক্রিয়াধীন। খোকসার বিভন্ন পর্যায়ের মানুষ পথে, ঘাটে, মাঠে, বাসায়, স্কুল-কলেজে, ফেসবুকে এই গ্রুপের আলোচনায় মশগুল। আর একটু দূরে যারা থাকেন খোকসা থেকে বা বয়সে প্রবীন তাঁরাতো লস্টালজিয়াতে আছেন গ্রুপকে কেন্দ্র করে। অনেক উপভোগ করবে।

এ সম্পর্কে গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা আইনুল হোসেন শানু বলেন,

” আমাদের লক্ষ্য অনেক সুদূরপ্রসারী। যেখানে মসজিদ করতে গেলেও লোকের বাঁধা আর সমালোচনা হয়। সেখানে ১% লোকের এমন আচরনে থেমে যাওয়ার কিছু নেই। আমরা তো বলছি না যে অফিসে যেয়ে এই আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করো। তবে আমাদের এই ঐতিয্যকে আমাদের কমিউনিটিতে স্মরন করা এবং নতুন প্রজন্মকে জানান দেয়া টা দোষের কিছু না নিশ্চয়। যতই ঢাকা, আমেরিকা থাকি, ইংলশ বলি – মাটির টান, নাড়ির টান কি ভোলা যায়? আর যারা বিরোধীতা করেছে হাতে গোনা কয়েকজন ওদের বয়স কম, ভূল হতেই পারে। তাছাড়া মত, চিন্তা, যুক্তি সবসময় সবার সাথে মিলে না। এটাই স্বাভাবিক। গঠনমূলক সমালোচনা সবসময়ই ভালো। কিন্তু জ্ঞানপাপী হয়ে শিষ্টাচার ভুলে বড়দের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরন কখনই কাম্য নয়। আল্লাহ অবশ্যই একসময় তাঁদের সুবুদ্ধি দেবেন। আমরা বড় হয়ে তাই ওদেরকে আইনী বিষয়ে জড়াতে চাইনি।”

(Visited 479 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *