কে পাচ্ছেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব

কুষ্টিয়া প্রতিনিধিঃ কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর। সেই সম্মেলনে দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে হাজী রবিউল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়। এতে জটিলতা দেখা দিলে হৈ চৈ সৃষ্টি হয়। পরে দীর্ঘক্ষণ সমঝোতার পর সদর উদ্দিন খানকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আজগর আলী সাধারন সম্পাদকের পদ ঘোষনা করেন তৎকালীন সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর হাজী রবিউল ইসলামকে সিনিয়র সহ-সভপতি করা হয়। তবে দলে গ্র“পিং থাকায় আনোয়ার আলীর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ আলাদা সম্মেলন করে পাল্টা কমিটি জমা দেন। এরপর দুই গ্র“পের নেতাদের সমন্বয় করে ২০১৬ সালে পুর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয়া হয় কেন্দ্র থেকে। এ কমিটির মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে যে গ্র“পিং চলছিল তার নিরসন হয়। তবে ভিতরে ভিতরে প্রতিযোগিতা, মনমালিন্য ও দ্বন্দ্ব এখনো নিরসন হয়নি।

এই অবস্থার মধ্যে আগামী ২৮ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় সম্মেলন ঘিরে উত্তেজনা চলছে, কারা নেতৃত্বে আসছেন তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। পুরাতনরা থাকছেন না নতুনরা আসছেন তা নিয়ে নেতা-কর্মিদের মধ্যে চুল চেরা বিশ্লেষন চলছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া কুষ্টিয়ার বিভিন্ন উপজেলার সম্মেলন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান, আসন্ন কেন্দ্রীয় সম্মেলন এখানে প্রভাবক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সদর উদ্দিন খানের একই পদে পুনরায় বহাল থাকার বিষয়টা মোটামুটি নিশ্চিত। সদর উদ্দিন খান খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও তিনি। পাশাপাশি রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম। সদর উদ্দিন খান ও রবিউল ইসলাম দু’জনই দীর্ঘদিন আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত।

বর্তমান সভাপতি সদর উদ্দিন খান বলেন, দীর্ঘদিন দল করে আসছি। সভাপতি হিসেবে দলকে শক্তিশালী করার কাজ করেছি। নেতা-কর্মিরা আমার কাজের মূল্যায়ন করবে। দলীয় সভানেত্রী চাইলে দলের জন্য কাজ করতে রাজী আছি।

দলের বর্তমান সাধারন সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন। তিনি দুই মেয়াদে একই পদে আছেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এ নেতা বিভিন্ন সময় দলের নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারো তাকে একই পদে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এই নেতার পরিবর্তে নতুন কেউ এ জায়গা দখল করতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

আজগর আলী বলেন, জেল, জুলুম নির্যাতন আর ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে রাজনীতির মাঠে পড়ে আছি। দলকে ভাঙ্গিয়ে কোন অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি করেছি কেউ বলতে পারবে না। এখন চাওয়া-পাওয়া নেই। নেত্রী যেভাবে চাবেন সেইভাবেই দল চলবে। আমাদের নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ ভাইয়ের নেতৃত্বে দল আগের তুলনায় ঐক্যবদ্ধ এটুকু বলতে পারি। তাই আসন্ন কাউন্সিল জাঁকজমক ও বর্ণিল করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নেতা কারা হবে সে সিদ্ধান্ত দল ও কর্মিরা নেবে।’

এছাড়া দলের দুঃসময়ের আরেক নেতা কুষ্টিয়া পৌরসভার বারবার নির্বাচিত মেয়র  আনোয়ার আলীকে শেষ বয়সে দলের শীর্ষ পদে দেখা যাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আনোয়ার আলী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘদিন। দলের দুঃসময়ে তিনি নির্যাতন সহ্য করে দলকে সংগঠিত করেন। দলে তার অবদান নেতা-কর্মিরা এখনো ভূলিনি। তাইতো দলীয় সভানেত্রী বারবার তার কাজের মূল্যায়ন করেছেন। এবার তাকে দলের শীর্ষ পদে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনা চলছে। তবে বয়স হওয়ার কারনে আগের মত দলীয় কাজে অংশ নিতে পারেন না তিনি।

আনোয়ার আলী বলেন, ‘ আমি আওয়ামী লীগের একজন কর্মি। সারাজীবন দলের জন্য কাজ করে আসছি। দলের একজন কর্মি হয়ে থাকতে চাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারিরা দলের সব থেকে ক্ষতি করছে। দলের দঃসময়ে কাউকে পাওয়া যায় না। তাই বঞ্চিত ও ত্যাগী নেতা-কর্মিদের তুলে আনতে হবে। তাহলে দল বাঁচবে।’

জাহিদ হোসেন জাফর বলেন, ৪ যুগের বেশি তৃণমুলের রাজনীতির সাথে জড়িত। দলের একজন কর্মি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। নেত্রী যদি মনে করেন জেলা আওয়ামী লীগের হাল ধরতে রাজী আছি। তবে পদ না পেলেও কোন দুঃখ নেই। তবে সৎ ও যোগ্যদের হাতে যেন দলের ভার দেয়া হয় এমন দাবি থাকবে।’

ইতোমধ্যে জাহিদ হোসেন জাফর, সদর উদ্দিন খান ও আনোয়ার আলী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করেছেন।

দলের যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক স্বাচিপ ও বিএমএ নেতা ডা. এ এফ এম আমিনুল হক রতন ও সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুর রউফের নাম যোগ হয়েছে এ তালিকায়। রতন দীর্ঘ সময় দলের নানা পদে ছিলেন। সর্বশেষ কাউন্সিলে তিনি সাধারন সম্পাদক পদে চেয়েছিলেন। আর আব্দুর রউফ ছাত্রলীগ করেছেন, জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। আর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন একটা সময়। ৭৫’ পরবর্তী দলকে সংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আব্দুর রউফ কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ২০১৪ সালের নির্বাচনে। সর্বশেষ নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হন এ নেতা। তাই এবার দলের গুরুত্বপূর্ন কোন পদে তাকে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ডা. আমিনুল হক রতন বলেন,‘ পরিচ্ছন্ন রাজনীতি শুরু হয়েছে নেত্রীর হাত ধরে। বিতর্কিত ও সুবিধাবাদিদের দল থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন নেত্রী। যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানায়। জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে ত্যাগী ও তৃণমুলের নেতারা জায়গা পাবেন এমনটা আশা করছি।’

এদিকে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বর্তমান কমিটির বিতর্কিত কয়েকজন নেতার নাম উঠে এসেছে। তাদের নেতিবাচক রাজনীতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া দলের গ্রপিং নিরসন করতে না পারা, উপজেলায় নতুন গ্রুপিং সৃষ্টি, সাংসদদের সাথে দুরত্ব, নানা অনিয়ম, দুর্নীতির অতীতের রাজনীতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কপাল পুড়তে পারে কারো কারো।

আগামী ২৮ নভেম্বর সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া ইসলামী কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান অতিথি থাকবেন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

(Visited 189 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *