করোনার ক্রান্তিকালে মানবতার কাণ্ডারী ডক্টর যশোদা জীবন দেবনাথ

টেলিভিশনে টক শো, সেলিব্রিটি শো আর মাইক্রোইকোনমির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনার কারণে সাম্প্রতিক বিশেষ আলোচনায় ডক্টর যশোদা জীবন দেবনাথ। তিনি বেঙ্গল ব্যাংকের পরিচালক। এর চেয়েও তিনি অধিক পরিচিত টেকনোমিডিয়া লিমিটেড, মানি প্লান্ট লিঙ্ক ও প্রোটেকশন ওয়ান প্রাইভেট লিমিটেডের কারণে। আমরা যে এটিএম মেশিন ব্যবহার তার সিংহভাগ সরবরাহ করে তাঁর প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, করোনার এই দুর্যোগে ব্যাংকের টাকা এক স্থান থেকে আরেক জায়গায় নিরাপদে নিয়ে যাবার জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সুবিদিত।

ডক্টর দেবনাথ এরইমধ্যে তাঁর নিজ এলাকা ফরিদপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নসহ ঢাকায় কর্মরত নিম্নআয়ের মানুষের সেবা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। উপাধি পেয়েছেন মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে। এখন অব্দি এই সেবা কার্যক্রম তিনি অব্যাহত রেখেছেন। চাঁদপুর ইউনিয়নে ইতোমধ্যে আগামী এক মাসের চাল মজুদ করে দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন, সেখান থেকে ১০ টাকা মূল্যে সবাই চাল কিনতে পারেন। এমনকি হতদরিদ্র মানুষেরা বিনামূল্যে চাল সংগ্রহ করতে পারবেন। 

পাশাপাশি নিত্যকার তরিতরকারি কিনতে যা লাগবে সেই টাকাটিও তিনি বহন করছেন। একইভাবে তিনি কম্পিউটার সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকার পথে পথে দরিদ্রদের জন্য খাবার যোগান দিচ্ছেন। কম্পিউটার সমিতির সদস্য হিসেবে তিনি করোনার কিট আবিষ্কারে কিভাবে ভূমিকা রাখবে এদেশিয় বৈজ্ঞানিকরা তারও উপায় বাতলানোর চেষ্টায় আছেন। 

যশোদা জীবন ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এক হাজার পিপিই দিয়েছেন। ফরিদপুরে ফাউন্ডেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে আরও পিপিই বানানোর কাজ চলছে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার ও সেবিকাদের জন্য এক হাজার পোষাক বিতরণ করেছেন। মাস্ক সরবরাহ করেছেন বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে। ঢাকায় কর্মজীবীদের মাস্ক সরবরাহ করেছেন আরও আগে। এসব কাজ এখনো চলমান-জানান ডক্টর যশোদা জীবন ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী। 

এক সপ্তাহ আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনয় করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, রাজেন্দ্রপুরে তাঁর একটি ইকো রিসোর্ট রয়েছে। যেটি দৃষ্টিনন্দন এবং পরিচ্ছন্ন। রোগীবান্ধব এই রিসোর্টটি তিনি কোয়ারেনটাইনের জন্য দান করতে চান। 

তিনি লিখেছিলেন- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি-। গাজীপুর আমাদের রাজেন্দ্র ইকো রিসোর্ট লিমিটেড নামে একটি রিসোর্ট আছে। সেখানে ১০০টিরও উপরে সুসজ্জিত রুম আছে। সরকার যদি ইচ্ছে পোষণ করেন বিনামূল্যে কোয়ারান্টাইন সেন্টারের জন্য রিসোর্ট দিতে প্রস্তত।’

শ্যামপুর সুগার মিলের পরিচালক ডক্টর যশোদা জীবন দেবনাথ। এলাকার মানুষের সঙ্গে রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। তিনি বলেন, বাংলাদেশটা আমার কাছে ছোট্ট একটি গ্রাম। এখানে সবাই আমার প্রতিবেশি। মহল্লার ছোট-বড় ভাই বোন, কাকা কাকিমা কিংবা নিকটজন। 

তাঁর বিশ্বাস-বাংলাদেশ শিগগিরই পৃথিবীর সেরাশক্তিতে পরিণত হবে। এদেশের শিল্প, কৃষি মডেল হবে অন্যদের কাছে। এই পরিস্থিতে তিনি বাবার জায়গাটি করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য দান করবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি লিখেছেন- ‘ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।আমার বাবার পৈত্রিক সম্পত্তি দান করেছিলাম একটি সরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য। পাশাপাশি ফরিদপুরের গণমানুষের শ্রদ্ধেয় নেতা এমপি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নির্দেশক্রমে একটি পুলিশ ফাঁড়ি করেছিলাম। যা এখন খালি পরে আছে এবং আমার গ্রামের বাড়িতে আমার মায়ের থাকার একটি ঘরও রয়েছে। যার সবটাই ফরিদপুরবাসীর এই ক্রান্তিকালে কোয়ারেনটাইনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করতে চাই। বন্ধুরা, শুধু আমার মাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও…।’

ডক্টর যশোদার এই লেখাটির প্রশংসা করেছেন সংস্রাধিক। একইভাবে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বানও রয়েছে তাঁর এই লেখাটিতে। কখনো কখনো পুলিশের জন্য তিনি প্রণোদনা দিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এই পেশার লোকজনের প্রতি অনেকেই নানা কারণে ক্ষুব্ধ। যে কারণে ভালো কাজ করেও সঠিক মূল্যয়ন পান না বেশিরভাগ পুলিশ। তিনি ছবিসহ একজন মাঠের পুলিশকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন এই ক্রান্তিকালে, যা কারও চোখ এড়িয়ে যায়নি। 

তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন-‘এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী যেভাবে কাজ করছে তাতে তারা অশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু আমাদের ডাক্তার ভাইয়েরা যারা এই ক্রান্তিলগ্নে একমাত্র প্রধান যোদ্ধা তারা অনেকেই দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। এখনো বাংলাদেশে মহামারি শুরু হয় নাই- ডাক্তার ভাইদের অনুরোধ করছি- দায়িত্ব অবহেলা করবেন না। আপনারাই আমাদের এই মুহূর্তে একমাত্র যোদ্ধা এবং ভরসার জায়গা।’ 

তাঁর অভিমত-‘বন্ধুরা, আমার গর্বে বুক ভরে উঠছে। ফরিদপুরে পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর জাকির হতদরিদ্র এক রিক্সাচালক বৃদ্ধার মুখে মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে। আর একেই বলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ। বন্ধুরা এই মহামারির সঙ্গে যুদ্ধ মোকাবিলা এভাবেই করতে হবে। সকলেই আমরা সকলে তরে….।’

আমেরিকানদের বিশাল একটি দল চার্টাড বিমানে নিজ দেশে গেছেন একদিন আগে। কেউ কেউ সাথে নিয়েছেন পোষা কুকুর। যশোদা জীবন দেবনাথ লিখেছেন-‘বাংলাদেশে অবস্থানরত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫০ জন নাগরিক সোমবার (৩০মার্চ) সন্ধ্যায় ঢাকা ছেড়েছেন। এই দুর্যোগে আমরা ধরে নিলাম তারা দেশপ্রেমের কারণেই তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন অথবা সারা পৃথিবীতে এই করোনা ভাইরাসের কারণে দেশকে ভালোবেসে হয়তো মাতৃভূমিতে তারা ফিরে গেলেন আপনজনের কাছে।

আমাদের দেশের অনেকেই তাদের আপনজনকে ছেড়ে বিদেশে অথবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছেন। আমি ঐ সমস্ত বন্ধুদের অনুরোধ করছি, নিজ নিজ জায়গায় থেকে আপনজনের খোঁজখবর নিন এবং যদি সম্ভব হয় দেশের হতদরিদ্র মানুষের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়ান। কারণ আমরা খুবই কঠিন সময় পার করছি। সৃষ্টিকর্তাই জানেন আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তবে আমরা মাতৃভূমিকে ভালোবেসে এদেশের জন্য মঙ্গল কামনা করি আর দুঃখী মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। যারা দিন আনে দিন খায় ঐ সমস্ত মানুষগুলো বড়ই অসহায় হয়ে পড়েছে। আসুন সবাই একযোগে তাঁদের পাশে দাঁড়াই। তাঁদেরকে নিজের আত্মীয়স্বজন ভাবি। 

নিজের ইউনিয়ন ফরিদপুরের চাঁদপুর খুলেছেন সততা স্টোর। সেখানে প্রতিকেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা। এ ব্যাপারে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন-‘ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে আজ আমি ফরিদপুর জেলার “চাঁদপুর ইউনিয়নে” (আমার নিজগ্রাম) সততা_স্টোর নামে একটি চালের দোকান চালু করলাম। যেখানে শুধুমাত্র চাঁদপুর ইউনিয়নবাসীর জন্য নামমাত্র ১০টাকা মূল্যে প্রতি কেজি চাল বিক্রি করা হবে। আমাদের সমাজে নিম্ন-মধ্যবিত্তরাও চক্ষুলজ্জায় অনেক সময় মানুষের কাছে সহযোগিতা পেতে অসহায়বোধ করেন। অথচ তাদেরও সমস্যা রয়েছে! তাই নামমাত্র মূল্য পরিশোধে সকল শ্রেণীর লোক এই সহযোগিতা নিতে পারবে। 

বন্ধুরা,আমি হয়তো অনেক পারবো না। অন্তত বাংলাদেশের একটি ইউনিয়নের মানুষের মুখে হাসি দেখতে চাই। আমি ধন্যবাদ দিতে চাই ছাত্রলীগের ছেলেরা নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে সঠিক দায়িত্ব পালন করার জন্য। বন্ধুরা, এখনই দুখী মানুষের পাশে থাকার শ্রেষ্ঠ সময়। 

তাঁর আরেকটি আলোচিত স্ট্যাটাস হচ্ছে সবাইকে সাবধান করবার জন্য। তাঁর অভিমত, নাইন ইলেভেনের পর আমেরিকার মনে হয়েছিল তাদের শৃঙ্খলাবাহিনী ততোটা চৌকস নয়। যতোটা তারা ভাবতেন। তাদের অনেক কিছুতেই ঘাটতি রয়েছে। নিউইয়র্কে এবার করোনার হানা ও একের পর এক মৃত্যুতে নতুন করে মনে হচ্ছে-আমেরিকার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যথেষ্ঠ ত্রুটি রয়েছে। বাইরে থেকে অন্যরা যা মনে করে ঘটনা আসলে তা নয়। উদাহরণ যেমন জাপান। শুধু কৌশল অবলম্বন করে এতোবড় মহামারী থেকে সেখানকার মানুষকে সুনিরাপত্তা দিচ্ছে। 

বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর তাই উদাত্ত আহ্বান-‘বন্ধুরা, আগামীকাল থেকে পরবর্তী সাতদিন সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকতে হবে। আগামী সাতদিন কোনভাবেই বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে না। প্রয়োজনে খাদ্যদ্রব্যের জন্যও না। যদিনা এটা খুব বেশি প্রয়োজন না হয়। কাল থেকে সবচেয়ে বাজে সময়টা শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে যারা যারা সংক্রমিত হওয়ার তারা তারা সংক্রমিত হয়ে গেছেন, হচ্ছেন। 

এখন আপনি বাইরে বের হলেই সংক্রমিতদের মুখোমুখি হতে পারেন। সুতরাং, ঘরে থাকাটা খুবই জরুরী। সচেতন থাকাটা সবচেয়ে বেশি দরকার। কেননা আগামীকাল থেকে সময়টা খুবই সংকটময়। ৭ই এপ্রিল পর্যন্ত আমরা নিজেরা নিজেদের খেয়াল রাখব। এই ভাইরাসের তাণ্ডব দু’সপ্তাহের বেশি থাকে না। এরপর এটা কিছুটা শান্ত হয় এবং শক্তি হারাতে থাকে।ইতালি এই রোগ সংক্রমণের দুই সপ্তাহকে কোনভাবেই পাত্তা দেয় নাই। যার ফলে আজকের দিনে তাদের ওখানে মৃত্যুর মিছিল। সুতরাং ৭ এপ্রিল পর্যন্ত কোথাও কেউ যেন বের না হয়। এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যের সাথেও দেখা না করে। এতেই সবার মঙ্গল। নিজে সচেতন থাকুন এবং ভার্চুয়ালি এই মেসেজ পৌঁছানোর মাধ্যমে অন্যকে সচেতন থাকতে সাহায্য করুন। আমাদের বিজয় হবেই এবং আমাদের করোনামুক্তি বিশ্বের কাছে রোলমডেল হবে। 

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে যশোদা জীবন দেবনাথ সিআইপি লিখেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। আমাদের জাতীয় ক্রিকেট টিম ৫০শতাংশ বেতন ছেড়ে দিয়েছে। সরকার একা বা জাতীয় ক্রিকেট টিমের সহযোগিতায় শেষ নয়। আমাদের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ভাইদের এই ক্রান্তিলগ্নে এগিয়ে আশার পালা।’

ডক্টর যশোদার এসব আর্তি আর চাওয়া ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। একটির পর একটি তিনি স্ট্যাটাস দিয়ে জনগণকে পাশে থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। আমরাও চাই, যশোর জীবনের চাওয়াটুকু পূরণ হোক। এই ক্রান্তিকালে একে অপরের পাশে ঝাঁপিয়ে পড়ুক।

লেখক : হেড অফ ইনপুট, একুশে টেলিভিশন

(Visited 16 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *