করোনা মোকাবেলায় পাশে আছে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন। 

কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার মত মফস্বল শহর থেকে ছোট পরিসরে ২০১৯ সালের মে মাসে সংগঠনটি যাত্রা শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে কোন পৃষ্টপোষক বা আর্থিক অনুদান বাদেই খোকসা উপজেলার মধ্যে কাজ করতে থাকে সংগঠনটি। চারজন ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করে, প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করতে থাকে, আগুনে পোড়া গৃহহীনকে ঘর করে দেয়, দরিদ্র মেধাবী শিশুদের শিক্ষা উপকরন কিনে দেয়, খোকসার সর্বস্তরের মানুষের দাবী আদায়ে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে আইল্যান্ডের জন্য মানববন্ধন এবং অবরোধ কর্মসূচী করে, কিছু মেডিকেল ক্যাম্প এর আয়োজনেও পারদর্শিতা দেখায় সংগঠনটি। সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পায় খোকসা বাসস্ট্যান্ডে আইল্যান্ডের জন্য আন্দোলন এবং নিয়মিত বিনামূল্যে রক্তদান কর্মসূচী। দিনে দিনে খোকসার মানুষের ভালবাসা এবং বিশ্বাস অর্জন করতে থাকে সংগঠনটি। কিছু অসাধু চিন্তাধারার লোকজন বিভিন্নভাবে সমালোচনা এবং সামাজিক কাজে বাঁধা দেয়ার চেষ্টাও করে। নতুন সংগঠন হিসাবে নিবন্ধন না থাকায় বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক মহলের প্রশ্নের সম্মুখিনও হয়। কিছু সদস্য বিচ্ছিন্নও হয়ে যায় এসময়। কিন্তু হাল ছাড়েনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আশিক হাসান। সকল বাঁধা-বিপত্তি, সমালোচনাকে মোকাবেলা করে নিজ অর্থায়নে দৃঢ় নেতৃত্বে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যায়। দিনে দিনে খোকসার মানুষের কাছে খোকসার অপরিহার্য অংশ এবং উপকারী হিসাবে ভালবাসা পায় সংগঠনটি। প্রশাসনিক আর রাজনৈতিক নেতারাও সুদৃষ্টিতে দেখতে থাকে সংগঠনকে। কোন সরকারী বা রাজনৈতিক অনুদান বাদেই চৌকষ নেতৃত্ব এবং সাংগাঠনিক দক্ষতা দিয়েই খোকসার গন্ডি পেরিয়ে আজ সারাদেশে মানবতার সেবায় প্রতিনিয়ত কাজ করছে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন এর একঝাক স্বেচ্ছাসেবী।

করোনা ভাইরাস এর কারনে পুরো বাংলাদেশ যখন আতংকে, চারিদিকে মৃত্যুর মিছিলের আশংকা, দুর্ভিক্ষ আর মহামারীর সম্ভাবনা তখনও সাধারন মানুষের পাশে এসে দাড়িয়েছে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন এর অকুতোভয় এক ঝাক সৈনিক। কাজ করে যাচ্ছে নিরবে নিভৃতে।

এবিষয়ে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান আশিক হাসান বলেন,

করোনা ভাইরাস বিষয়ে তেমন কিছুই করতে পারিনি মানুষের জন্য। এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ইচ্ছাশক্তি থাকলেও সামর্থ্যের কাছে অনেক স্বপ্নই বাস্তব করা সম্ভব হয় না। তবুও যতটুকু পেরেছি চেষ্টা করে যাচ্ছি আপনাদের দোয়া আর আল্লাহর রহমতে। কাজ করে গেছি নিরবে, নিভৃতে।

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস আতংকে আতংকিত। এরপর লকডাউন, কোয়ারান্টাইন, প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, কলেজ- ভার্সিটি বন্ধ, সরকারী ছুটি, যাতায়াত ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, জনগনের মধ্যে আতংক ইত্যাদি কারনে রক্তদাতা পাওয়া যেকোন সময়ের থেকে কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু হাসপাতাল, ক্লিনিকে রক্তের অভাবে আহাজারি থেমে নেই। এর মধ্যেও নিয়মিত রক্তদান নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে সারাদেশে কাজ করতেছে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন এর ভলেন্টিয়াররা। আমার নিজ এলাকা খোকসাতেও কোন ব্লাড রিকুয়েষ্ট মিস করিনি এই ক্রান্তিলগ্নেও। বিশেষ প্রশাসনিক অনুমতি নিয়ে ডোনারকে নিজে যেয়ে রক্ত দিতে নিয়ে আসা হয়েছে। আমি নিজেও রক্ত দিয়েছি বাচ্চা শিশু যখন অ্যাক্সিডেন্ট করে রক্তের অভাবে মুমূর্ষ অবস্থায় রক্ত পাচ্ছিল না। বাংলাদেশের আট বিভাগেই স্বেচ্ছাসেবক রা দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে মানবতার সেবায়।

কেন্দ্রীয় সদস্য এবং বিভাগীয় সমন্বয়কদের সাথে নিয়ে ফাউন্ডেশনের জেলা-উপজেলার নেতৃবৃন্দকে করোনা ভাইরাস বিষয়ক সমূহ তথ্য, আপডেট প্রতিনিয়ত দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহন, ফান্ড তৈরী, প্রচারনা, প্রশাসনিক নিয়ম, চিকিৎসা সেবা, স্প্রে তৈরীকরন, রক্তদাতার প্রতি কর্তব্য ইত্যাদি বিষয়ে সমূহ নির্দেশনা এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে বিভিন্ন কার্যক্রম এ উদ্বুদ্ধকরণ। এক্ষেত্রে শুরু করে গেছি আমরা। স্যানিটাইজার স্প্রে, হাত ধোয়া, খাদ্যদ্রব্য বিতরন, ফায়ার সার্ভিস এর ব্যবহার, মাস্ক বিতরন ইত্যাদি বিষয়ে আমরা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের দারে দারে গিয়ে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ কাজই আমরা বলার পর তাঁরা করেছে দেরীতে হলেও। আমরা ক্লিনিক আর হাসপাতাল গুলোকে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করতে বলি, আমরা প্রশাসনকে ফায়ার সার্ভিস এর ব্যবহার করতে আহবান জানাই, আমরা বিভিন্ন এলাকায় এবং প্রশাসনিক ভবনে স্প্রে কার্যক্রম করেছি এবং অন্য সংগঠন কে করতে উৎসাহ দিছি, আমরা অসহায় লোকদের লিস্ট করতে আহবান জানাই, আমরা বিভিন্ন সামর্থবান লোককে গিয়ে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানাই। এগুলো হয়তো আপনারা দেখবেন না, জানবেন না, কিন্তু সুফল অবশ্যই পাবেন।

নিজে খোকসা- পাংশা-কুমারখালীর বিভিন্ন জায়গায় থানা, ঘাট, ক্লিনিক সমূহ, বিভিন্ন ইউনিয়ন, গ্রাম, বাড়িতে যেয়েও স্যানিটাইজার স্প্রে ও করেছি। বিভাগীয় এবং জেলা প্রতিনিধিরাও করেছে সাধ্যমত। আমরা যেখানে গেছি ফ্রী তে হ্যান্ডওয়াশ বা হেক্সাসল দিয়ে জীবানুমুক্ত করতে সহায়তা করেছি সবাই কে। বিভিন্ন এলাকায় এবং বাড়িতে নিজেরা গিয়ে লিফলেট ও দিয়েছি আমরা অনেক জায়গায়। মেডিসিন এর দোকানে যখন স্যানিটাইজার মার্কেট আউট, তখনও ন্যয্যমূল্যে সরবরাহ করেছি স্যানিটাইজার বিভিন্ন মেডিকেল প্রতিষ্ঠান এ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে। ফেসবুকে গ্রুপ, মেসেঞ্জার এবং টাইমলাইন এ প্রতিনিয়ত সচেতনতামূলক, তথ্যমূলক আপডেট দিয়ে গেছি আমরা। যারা ফেসবুক চালান অবশ্যই জানেন। অনলাইন এবং অফলাইনে চিকিৎসা সেবা দেয়ারও চেষ্টা করেছি যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত, কিন্তু বাইরে বের হতে ভয় পেয়েছে। এক্ষেত্রে মেডিকেল স্টাফরা সবসময়ই পাশে ছিল আমাদের।

প্রথমপর্যায়ে ফাউন্ডেশন এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে উদ্যোগ নিয়ে দাতা সদস্যদের অর্থায়নে সারাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় এবং জেলা শহরে প্রায় ৫০০০ জনের সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ক্রান্তিলগ্নেও গরীব অসহায় ২ জন রোগীকে আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হয়েছে কোন ফান্ড গঠন বা কালেকশন বাদেই। ব্যক্তিগত অর্থায়নেও ৩০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা করেছি। কিছু বন্ধু, বড়ভাই, শুভাকাঙ্খীদের অর্থায়নে খোকসা উপজেলায় ৬৯২ জনকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছি। বর্তমানে খোকসা পুলিশ প্রশাসন এর উদ্যোগে মধ্যবিত্তদের সাহায্যের জন্য হটলাইন সার্ভিসে এডমিন হিসাবে কাজ করছি। এরপর ২২শে এপ্রিল থেকে খোকসা উপজেলা কল্যান সমিতি – ঢাকা এর উদ্যোগে খোকসা উপজেলার কিছু মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরন কাজেও থাকবো। আর রমজান মাসে ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আরও ৩ লক্ষ টাকার খাদ্যসামগ্রী বিতরন এবং ভ্রাম্যমান মেডিকেল ক্যাম্প করার ইচ্ছা আছে। পাশাপাশি নিয়মিত কার্যক্রমও চলবে। দেখি পরবর্তী দিনগুলো কি আছে ভাগ্যে।

আসলে ভুলে যাবেন না আমাদের ও পরিবার আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে। আমরা মৃত্যুর পরোয়া না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানবতার সেবায় আপনাদের জন্যই কাজ করেছি যতটা পেরেছি। একটুও যদি উপকার করতে পারি তাতেই আমরা স্বার্থক। আমরা সাহায্য প্রদানের কোন ছবিও তুলিনা। আমরা প্রকৃত অসহায় মানুষ বের করি বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন এবং যাচাইয়ের মাধ্যমে। আর ভবিষ্যতে সরকারী নিবন্ধনের জন্য শীঘ্রই আবেদন করার পরিকল্পনা আছে। প্রশাসন থেকে সমর্থন পেলে আরও ভাল কিছু করার ইচ্ছাশক্তি আমার আছে।

পরিশেষে এটাই বলবো, আমরা অনেক হুমকির মধ্যে আছি। আমরা বুঝতেছিনা সেটা। লকডাউন মানছিনা, হোম কোয়ারান্টাইন নিশ্চিত হচ্ছে না, ফলে আক্রান্ত এলাকার রোগী ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। যা ভয়াবহ ক্ষতি করবে আমাদের। এছাড়া ত্রান বিতরনের সময়ও প্রটোকল দিতে যেয়ে সামাজিক দুরত্ব মানছে না, এর ফলও সুখকর নয়। পুলিশ-ডাক্তার-স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দোয়া করি। জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবারও অনুরোধ করছি জনগনের টাকার ত্রান জনগনকে দিচ্ছেন, দয়া করে দুর্নীতি বা শো-অফ করবেন না।

(Visited 85 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *